বর্ষায় নিকলী বেড়িবাঁধ ও দিগন্ত বিস্তৃত ঘোড়াউত্রার জলরাশি
বর্ষার দিনে হাওর যেন এক অসীম জলসমুদ্র। চারপাশে থৈ থৈ পানি, মাথার ওপর বিশাল মেঘলা আকাশ আর বাতাসের সোঁদা গন্ধ। কিশোরগঞ্জের নিকলী বেড়িবাঁধে তখন শত শত পর্যটকের আনাগোনা। জলের ওপর রঙিন সাম্পান আর ট্রলারের গর্জন। কিন্তু পর্যটকদের এই উল্লাস ও রঙের খেলার আড়ালে লুকিয়ে থাকে আরেক হাওর—যেখানে প্রতিটি দিনই টিকে থাকার এক নিঃশব্দ লড়াই।
আফালের গর্জন ও রাতের আতঙ্ক
শহরের মানুষের কাছে হাওরের বর্ষা রোমান্টিক এক কবিতা, কিন্তু হাওরপাড়ের দ্বীপগ্রামগুলোর মানুষের কাছে বর্ষা মানেই ‘আফাল’ (উত্তাল ঢেউ)-এর ভয়। মাটির তৈরি ভিটাগুলো রক্ষা করতে রাত জেগে বাঁশ, চাটাই আর কচুরিপানার বেড়া দিতে হয়। একটু অসতর্ক হলেই এক রাতের ঢেউয়ে ভেসে যেতে পারে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি।
ছাতিরচর কিংবা গুরুইয়ের বয়োবৃদ্ধ মানুষদের মুখে শুনছিলাম সেই আতঙ্কের কথা। যখন ঝোড়ো বাতাস ওঠে, চারদিক ঘন কালো হয়ে আসে, তখন পরিবারের ছোট্ট শিশুদের দড়িতে বেঁধে খাটের পায়ার সাথে আটকে রাখতে হয়—পাছে ঘরের বেড়া ভেঙে বানের জলে ভেসে না যায়! এই নির্মম সত্য কোনো পর্যটকের ক্যামেরার লেন্সে ধরা পড়ে না।
নৌকাই যখন একমাত্র সম্বল ও আশ্রয়
বর্ষায় হাওরে কোনো হাঁটাপথ থাকে না। প্রতিটি বাড়ি যেন এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। হাসপাতাল, বাজার, স্কুল—সবকিছুর জন্যই দরকার নৌকা। গর্ভবতী মা কিংবা মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে মাঝপথে প্রসব বা মৃত্যুর ঘটনা এখানে নিত্যদিনের। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার খরচ দরিদ্র জেলের নাগালের বাইরে চলে যায়।
অথচ এই জলের বুকেই হাওরের মানুষ খুঁজে নিয়েছে বেঁচে থাকার ছন্দ। মাঝির কণ্ঠে তখন বেজে ওঠে বিচ্ছেদী সুর, ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নে রে, আমি আর বাইতে পারলাম না...’। দুঃখ আর সুর এখানে একাকার হয়ে জন্ম দেয় এক অদ্ভুত জীবনদর্শনের।
টেকসই পর্যটন ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
নিকলীতে এখন প্রচুর পর্যটক আসেন। অর্থনীতিতে কিছু নগদ টাকা ঢুকছে ঠিকই, কিন্তু সাথে সাথে ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক, লাউডস্পিকারের শব্দদূষণ আর স্থানীয় সংস্কৃতির ওপর আঘাত ক্রমেই বাড়ছে। আমাদের পর্যটন হওয়া উচিত দায়িত্বশীল। হাওরের রূপ দেখার পাশাপাশি হাওরের মানুষকে তাদের আত্মমর্যাদায় বোঝা এবং তাদের ঐতিহ্যকে সম্মান জানানোই একজন সচেতন নাগরিকের মূল কর্তব্য।